ডেঙ্গু ও তারমোকাবিলা

-ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী

ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিত দ্রুত নগরায়ন ও অ-পরিবেশবান্ধব মুনাফাসর্বস্ব বাণিজ্যের পাশাপাশি যেখানেই নিকাশী ব্যবস্থা বেহাল, পুর-পরিষেবা দুর্বল, সেখানেই মশা-মাছি সহ পতঙ্গকূলের বাড়বাড়ন্তের পরিবেশ অনুকূল। ফলে ডেঙ্গুর মত রোগ মহামারীর আকার নিচ্ছে। তার প্রতিরোধ দূর-অস্ত্, মানুষকে সচেতন করবার প্রয়াস বলতে কিছু ঢাউস ফ্লেক্স, যেখানে প্রয়োজনীয় তথ্য তথৈবচ, অহেতুক মুখচ্ছবির প্রচারই মুখ্য!

যে তথ্যগুলো সকলের জানা জরুরী –

২ থেকে ৭ দিনের আকস্মিক জ্বরের সঙ্গে নিম্নলিখিত রোগলক্ষণগুলির মধ্যে অন্ততঃ যে কোনো দুটি থাকলে তা সম্ভাব্য ডেঙ্গু বলে ধরতে হবে –

• চোখের পিছনে ব্যথা

• গাঁটে গাঁটে ব্যথা

• পেশীতে ব্যথা

• মাথাব্যথা

• শরীরের কোথাও রক্তক্ষরণ

• লালচে র‌্যাশ

শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর অল্প, র‌্যাশ বেশী হতে পারে। শিশু ও অল্পবয়সীদের হেমারেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক্ সিন্ড্রোমের আশঙ্কা বেশী।

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ‌মেনে রক্ত পরীক্ষা করা দরকার। র‌্যাপিড কিট-এ পরীক্ষা করাবেন না, কারণ এর ফলাফল সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য নয়। এলাইজা (ELISA = Enzyme Linked Immuno Sorbent Assay) পদ্ধতিতে রক্তপরীক্ষা করাতে হবে কোনো স্বীকৃত ল্যাবরেটরি থেকে। আপনার জ্বর যদি চার-পাঁচ দিনের বেশী না হয়, এনএস-১ অ্যান্টিজেন টেস্ট করাতে হবে। ডেঙ্গির ভাইরাসে দশ ধরণের প্রোটিন থাকে, তার মধ্যে তিনটি স্ট্রাকচারাল ও সাতটি নন্-স্ট্রাকচারাল (এনএস) প্রোটিন। এই সাতটি নন্-স্ট্রাকচারাল প্রোটিনের বিভিন্ন নাম আছে – এনএস-১, এনএস-২এ, এনএস-২বি, এনএস-৩, এনএস-৪এ, এনএস-৪বি ও এনএস-৫; এর মধ্যে প্রথমটি টেস্ট করা হয়। ডেঙ্গু হ’লে এনএস-১ সাধারণতঃ জ্বর আসার ২৪ ঘন্টা পর থেকেই  রিয়্যাক্টিভ বা পজিটিভ আসে। প্রথমবার ডেঙ্গু হ’লে জ্বর আসার প্রায় ৯ দিন অব্দি রক্তে এনএস-১ পাওয়া যায়, দ্বিতীয়বার হ’লে ৫ দিন অব্দি থাকে। এমন হতেই পারে যে আপনার আগে কখনো ডেঙ্গু হয়েছিল, আপনি জানতেই পারেন নি ! তাই, জ্বর আসার ৫ দিন অব্দিই এনএস-১ এর উপর ভরসা করবেন, তারপর নয়। মোটের উপর ৮৭ % ক্ষেত্রে সঠিক রিপোর্ট আসে।

এই পাঁচদিনে আপনার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অ্যান্টিবডি (যার আর এক নাম এম ইমিউনোগ্লোবিন) যথেষ্ট পরিমাণে তৈরী হয়ে গেছে। সুতরাং, এখন এম অ্যান্টিবডি বা এম ইমিউনোগ্লোবিন (আই.জি.এম.) টেস্ট করলে পজিটিভ আসবে।  প্রথমবার ডেঙ্গু হ’লে রক্তে এটি থাকে প্রায় তিনমাস। দ্বিতীয়বার থেকে অবশ্য এটি অতদিন থাকে না, পরিমাণেও কম তৈরী হয়। এম অ্যান্টিবডি ক্যাপচারিং (সংক্ষেপে এম.এ.সি. বা ম্যাক) এলাইজা পরীক্ষায় এটি জ্বর আসার পঞ্চম দিনেই ধরা দেয় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে। ষষ্ঠদিন থেকে ধরা দেবার সম্ভাবনা ৯৮ শতাংশ।

যে অ্যান্টিবডি বা ইমিউনোগ্লোবিন দেরীতে তৈরী হয়, তার নাম ‘জি’, অর্থাৎ ইমিউনোগ্লোবিন জি (আই.জি.জি.) – প্রথমবার ডেঙ্গু সংক্রমণের ক্ষেত্রে এটি জ্বর আসার ষষ্ঠদিন থেকেই তৈরী হ’তে শুরু করলেও রক্তে ধরা যায় আরো ক’দিন পর থেকে। কিন্তু এটি দীর্ঘকাল রক্তে থেকে যায়, পরবর্তীতে আবার ডেঙ্গু হ’লে তাই জ্বর আসার দিন থেকেই এটি পজিটিভ পেতে পারেন। সেজন্য এই পরীক্ষার তেমন গুরুত্ব নেই, যদি না একবার জ্বরের সময়, আরেকবার জ্বর সেরে গেলে – পরপর দু’বার এই টেস্ট করা হয় (সেক্ষেত্রে প্রথমবারের তুলনায় পরেরবার যদি এটির মাত্রা চারগুণ বেড়ে যায়, তবেই প্রমাণিত হবে যে সম্প্রতি ডেঙ্গু হংক্রমণ হয়েছিল)।

এছাড়াও রিয়্যাল টাইম রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ পলিমারেজ চেইন্ রিয়্যাকশন (আর.টি.পি.সি.আর.) পদ্ধতিতেও টেস্ট করা যেতে পারে। এদেশে সাধারণতঃ ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটে সেরোটাইপ পাওয়া যায়, তার মধ্যে কোন সেরোটাইপ দ্বারা আপনি আক্রান্ত হয়েছেন তা বোঝার জন্য প্লেক রিডাকশন অ্যান্ড নিউট্রালাইজেশন টেস্ট (পি.আর.এন.টি.) করা হয়। 

ডেঙ্গু ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি আপনা থেকেই সেরে যায়। এই সংক্রমণের ফলে প্রথমদিকে শরীরের কোষের ভিতর থেকে তরল পদার্থ কোষের বাইরে বেরিয়ে যায়, ফলে সেসময় বেশী মাত্রায় স্যালাইন দিতে হয় রোগীকে। আবার দু’তিন দিন পরে আপনা থেকেই ঐ বেরিয়ে আসা তরল পদার্থ কোষের ভিতরে ঢুকতে শুরু করে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ হতে পারে। তখন স্যালাইনের মাত্রা না কমালে শরীরে তরল‌ বেশী হয়ে গিয়ে হৃদযন্ত্রের বোঝা বাড়ায়। ফলে বিপদ হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট মাপে স্যালাইনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ জরুরী। অনেক সময় রক্তের অনুচক্রিকাগুলো কার্যক্ষমতা হারিয়ে একসাথে দলা পাকিয়ে যায়। ফলে গুনতিতে কম পড়ে। যন্ত্রে গোনার সময় এই দলা পাকানো অনুচক্রিকাকে চিনতে পারে‌না, ফলে সংখ্যা আরো কম দেখায়। ল্যাব টেকনিশিয়ান রক্তের নমুনা অণুবীক্ষণের তলায় রেখে গুনে দেখলে অতটা কম দেখায় না। সেক্ষেত্রে অনুচক্রিকা রক্তের ডেসিলিটার প্রতি দশ হাজারের নীচে নামলে তবেই বাইরে থেকে শরীরে অনুচক্রিকা প্রবেশ করাতে হয়। এমনিতে ডেঙ্গু সেরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কার্যক্ষমতা হারানো অনুচক্রিকাগুলো ফের কার্যক্ষমতা ফিরে পায়, দলা পাকানো অবস্থা থেকে পৃথক হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে গুনতিতে আবার বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে। চারটে সেরোটাইপের যে কোন একটি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হবার পর শরীরে সেই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরী হয়ে থেকে যায়, যা পরে কখনো ঐ একই সেরোটাইপ দ্বারা আক্রান্ত হলে তা প্রতিরোধ করে। কিন্তু পরের বার অন্য কোন সেরোটাইপের খপ্পরে পরলে আগের অ্যান্টিবডির সুবাদে অ্যান্টিবডি-নির্ভর সংক্রমণ বৃদ্ধি হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে রোগেল জটিলতা বাড়ে। সুতরাং ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, বিশেষতঃ জ্বরের সঙ্গে এই বিপদ-লক্ষণগুলি দেখা দিলে –

১) পেটে ব্যথা

২) বারবার বমি হয়েই যাচ্ছে

৩) বুকের ভিতর বা পেটে জল জমার লক্ষণ

৪) শ্লৈষ্মিক ঝি‍‌ল্লি বা মিউকোসা থেকে রক্তপাত

৫) তন্দ্রাচ্ছন্নতা এবং অস্থিরতা

৬) যকৃত বড় হয়ে গেলে

৭) ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় রক্তে প্যাকড্ সেল ভল্যূম (পি.সি.ভি.) বাড়লে এবং প্লেটলেট বা অনুচক্রিকার সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকলে।

এছাড়াও মারাত্মক ডেঙ্গুর লক্ষণগুলি হ’ল –

১) রক্তনালী থেকে প্লাজমা চুঁয়ে বেরিয়ে এলে – একেই বলা হয় ডেঙ্গু শক্ সিন্ড্রোম।

২) বুকে জল জমার ফলে শ্বাসকষ্ট।

৩) শরীরের নানা জায়গায় সাংঘাতিক রক্তপাত।

৪) শরীরের অন্যান্য যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিগড়ে যায় যকৃতের উৎসেচকের (এ.এস.টি. এবং এ.এল.টি.) মাত্রা, মস্তিষ্কে আচ্ছন্নতার উপসর্গ।

হৃৎপিন্ড, বৃক্ক ও অন্যান্য যন্ত্রেরও ক্ষতি হতে পারে। কারোর ডেঙ্গু হয়েছে সন্দেহ হলে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। রোগীর প্রতি ২৪ ঘণ্টা মনোযোগ দিতে হবে। রোগী পরিপূর্ণ বিশ্রাম নেবে, তাকে প্রচুর জল খাওয়াতে হবে, অন্তত দিনে ২/৩ লিটার। সব কিছুই খেতে পারে, তবে অরুচি হলে বারবার রোগীর পছন্দ মতো খাবার অল্প অল্প করে রোগীকে দিতে হবে। শরীরের তাপমাত্রা ৪/৬ ঘণ্টা অন্তর নিতে হবে থার্মোমিটারের সাহায্যে। ৩-৭ দিনের মাথায় স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা যদি কমতে থাকে, তাহলে সতর্ক হতে হবে ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনও জ্বরের ওষুধ চলবে না। রক্ত চাপও রোজ মাপতে হবে ও কমছে কিনা দেখতে হবে। পি.সি.ভি. তুলনামূলকভাবে বাড়ছে কি না সেটাও নজর রাখতে হবে। রোগীর খুব অস্থিরতা বা তন্দ্রাচ্ছন্নতা দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। বেশিরভাগ রোগীর বাড়িতেই চিকিৎসা সম্ভব।

ঈডিস মশা মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু ছড়াতে পারে দুভাবে –

(১) ডেঙ্গু রোগীর রক্ত খাবার পর মশার শরীরে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি হয়, মশার শরীরে লালাগ্রন্থিসহ সব জায়গায় ছড়িয়ে যায়। ৮-১০ দিন পর সংক্রামিত মশা সুস্থ লোককে কামড়ালে তার ডেঙ্গু হতে পারে।

(২) কোনও ডেঙ্গু রোগীর রক্ত খেয়ে মশা সঙ্গে সঙ্গে যদি কোনও সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ায়, মশার মুখে লেগে থাকা ভাইরাস ঐ সুস্থ ব্যক্তির রক্তে ঢুকবে এবং সে ৫/৬ দিন পর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে। এইভাবে একই পরিবারের কয়েকজন একসঙ্গে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে।

ডেঙ্গুর মোকাবিলা করবেন কিভাবে ?

১) কারোর ডেঙ্গু হয়েছে সন্দেহ হলে রক্তপরীক্ষার রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা না করে একজন নিশ্চিত ডেঙ্গু রোগী হিসাবেই তার শারীরিক অবস্থার উপর নজরদারি রাখতে হবে ও ডেঙ্গুর চিকিৎসা করে যেতে হবে।

২) কারোর ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে সন্দেহ হলে তাকে চারদিন-চাররাত্রি মশারির মধ্যে রাখতে হবে। তাহলে মশা তাকে কামড়াতে পারবে না, রোগ ছড়াবার সম্ভাবনা থাকবে না। ডেঙ্গু রোগ ছড়ানো বন্ধ করতে এই পদ্ধতি বিশেষ কার্যকর। সাধারণতঃ জ্বর আসার চারদিন পর মানুষের রক্তে আর ডেঙ্গু ভাইরাস থাকে না।

৩) যতশীঘ্র সম্ভব রোগ নির্ণয় ও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

৪) ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনও ওষুধ নেই। জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনও ওষুধ নয়।

৫) প্রচুর জল খাওয়াতে হবে। বারবার অল্প করে খাবার খাওয়াতে হবে। স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া বজায় রাখতে হবে।

৬) পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে।

৭) বেশিরভাগ রোগীকেই বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করানো সম্ভব। সাংঘাতিক ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসককে দেখাতে হবে বা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

ঈডিস বা গায়ে সাদা-কালো ডোরা-কাটা বাঘ-মশার নানান প্রজাতির মধ্যে আমাদের এদিকে দুটি প্রজাতিই মূলতঃ ডেঙ্গু ছড়ায় – ইজিপ্টাই ও অ্যালবোপিকটাস। কলকাতায় ঈডিস ইজিপ্টাই ৮০ শতাংশ, ঈডিস অ্যালবোপিকটাস ২০ শতাংশ। কিন্তু শহরতলিতে ঠিক উল্টো, অর্থাৎ, ঈডিস ইজিপ্টাই ২০ শতাংশ, ঈডিস অ্যালাবোপিকটাস ৮০ শতাংশ । প্রত্যন্ত গ্রামে সমীক্ষা করে দেখা গেছে ঈডিস ইজিপ্টাই ৩ শতাংশ, ৯৭ শতাংশ হচ্ছে ঈডিস অ্যালাবোপিকটাস। কিন্তু এই দুই প্রজাতির মশার ডিম পাড়ার জায়গা বা আঁতুড়ঘর মোটের উপর একই। এরা ডিম পাড়ে ঘরের ভিতরে এবং ঘরের বাইরে আশপাশে কোনও ছোট-বড় পাত্রে পরিষ্কার জল জমে থাকলে। ডিম পাড়ে কলসিতে, বালতিতে, মগে, জারিকেনে, ব্যাটারির খাপে, এয়ারকন্ডিশনার বা রেফ্রিজারেটরের ট্রেতে, অব্যবহৃত টায়ারে, ড্রামে, বাগানে বা চাতালে কোথাও অল্পস্বল্প জল জমলে, খানাখন্দে, চৌবাচ্চায়, ফুলদানিতে বা ফুলের টবে, ইঁট ভেজানো জলে, ছাদে জমা জলে। ঈডিস অ্যালবোপিকটাস কখনো-সখনো বাঁশঝাড়ে কাটা-বাঁশের গোঁড়ার গর্তে বা অন্য গাছের কোটরে জমা জলে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে লার্ভা হয়, আর এই লার্ভা থেকে পিউপা হয়ে পূর্ণাঙ্গ মশা হ’তে প্রায় ১১ দিন সময় লাগে। আমরা যদি প্রতি সাতদিনে একবার বাড়ির ভিতর ও আশপাশের মশার ডিম পাড়ার সম্ভাব্য সমস্ত জমা জল ফেলে দিয়ে পাত্রগুলোকে হয় নষ্ট করে দিই বা ঘষেমেজে পুনরায় ব্যবহার করি, তা’হলেই ভেক্টর ডেনসিটি বা মশার ঘনত্ব বিপদসীমার নীচে নেমে আসবে।

এর পরের ধাপ হ’ল যেখানে জমা জল ফেলা যাচ্ছে না, অর্থাৎ চৌবাচ্চা, নর্দমা ইত্যাদিতে বিভিন্ন ধরনের লার্ভানাশক তেল ছড়ানো (হেক্টর প্রতি দু’শো লিটার)। বিকল্প হিসেবে পোড়া মোবিল বা ডিজেলও কাজে দেয়। প্রতি দশ স্কোয়্যার ফিট উপরিতলে এক লিটার তেল ঢালতে হবে। এছাড়া লার্ভা মারার কীটনাশক অনেক আছে, যার মধ্যে অ্যাবেট-জাতীয় কীটনাশক অতি উত্তম। টেমিফস নামে বাজারে পাওয়া যায়, তরল ও বালি-দানা দুরকমই পাওয়া যায় – ৫০ লিটার দীর্ঘ নর্দমার জন্য এক লিটার তরল যথেষ্ট। দামও খুব বেশী নয়, তবে প্রোডাক্টগুলি সেন্ট্রাল ইনসেক্টিসাইড্ বোর্ড অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন কমিটি দ্বারা স্বীকৃত সংস্থা থেকে কিনতে হবে।

এখন প্রতি বছরই ডেঙ্গু ব্যাপক আকারে ছ‍‌ড়িয়ে পড়ছে। সময়টা আগস্ট থেকে নভেম্বর।  তাপমান আঠারো ডিগ্রী সেলসিয়াসের নীচে নামলেই প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। বর্ষার সময় থেকেই ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিতে হয়। ডেঙ্গু মশার ঘনত্ব কখন বাড়ে, তা জানার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সেটা সহজ। খরচ খুবই কম। ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় মশার ঘনত্বের উপরে নিয়মিত নজরদারি থাকলে ঘনত্ব বাড়লেই ডেঙ্গু ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়বে বলে ধরে নিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী আরও জোরদার করতে হবে। কোনও এলাকায় ডেঙ্গু দেখা দিলেই রোগী সম্পর্কে যেসব সতর্কতার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো পালন করতে হবে।

প্রাপ্তবয়স্ক ঈডিস মশা মারতে পতঙ্গনাশক রাসায়নিক মেশানো উত্তপ্ত ধোঁয়া ছড়ানো হয় বাড়ির আশেপাশে। আগে টেকনিক্যাল ম্যালাথিয়ন নামক রাসায়নিক ব্যবহার করা হত, এখন তার বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। ফলে এখন সাইফেনোথ্রিন ৫% ব্যবহার করা হয়। এর জন্য ফগিং মেশিন লাগে, আর লাগে পেট্রোল ও ডিজেল। সকাল ও সন্ধ্যায় ঈডিস মশা বেশী সক্রিয় থাকে বলে ঐ দুটি সময় ফগিং করলে সবচেয়ে ভালো ফল মেলে। সমস্ত বাড়ির দরজা-জানালা খুলে রেখে বাড়ির আশেপাশে ফগিং করতে হবে। প্রতিটা বাড়ির ভিতরে অন্ধকার কোণা গুলো থেকে ফগিং শুরু করে বাইরের দিকে এলে আরো ভালো হয়। তবে তা সময়সাপেক্ষ।

এছাড়া বাড়িতে দিনেরাতে দীর্ঘস্থায়ী পতঙ্গনাশক রাসায়নিকে চোবানো মশারী সর্বোত্তম। ডেল্টামেথ্রিন বা পাইরেথ্রিন নামক রাসায়নিক মশারীর ফাইবারে মেশানো থাকে। বিশেষতঃ জ্বর না ছাড়া অব্দি সবসময় ডেঙ্গু রোগীকে মশারীর মধ্যেই রাখতে হবে। ডেঙ্গুর মশা অন্ধকারে সাধারণতঃ কামড়ায় না, দিনের আলোয় বা রাতে কৃত্রিম আলোতেও কামড়াতে পারে। ফুলহাতা জামা ও ফুলপ্যান্ট, অর্থাৎ শরীরের অধিকাংশ ঢাকা থাকে এমন পোষাক পড়া ভালো। বাইরে কোথাও গেলে, সিনেমা হল বা অন্য কোন বদ্ধ ঘরে গেলে হাতে-পায়ে-গলায় মশা-বিকর্ষক ক্রীম মাখা যেতে পারে। ব্লিচিং পাউডারে মশা মরে না। ঈডিস মশা অন্যরাজ্য থেকে উড়ে আসা তো দূরের কথা, এক পাড়া থেকে অন্য পাড়াতেও উড়ে যেতে পারে না, এদের ফ্লাইট রেঞ্জ বেশী নয়।

ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগের বাড়বাড়ন্তের কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হ’ল অপরিকল্পিত দ্রুত নগরায়ন, যত্রতত্র কৃত্রিম জলধারণের পাত্র ফেলে রাখা, প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, নিকাশী ব্যবস্থার অপ্রতুলতার দরুন জল জমে থাকা, অপর্যাপ্ত পুর ও পঞ্চায়েত পরিষেবার ফলে সময়মত জঞ্জাল অপসারণ না হওয়া। ফলে ডেঙ্গু মোকাবিলায় একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কার্যকরী আন্তঃরাষ্ট্রীয় নীতিগ্রহণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ, দ্রুত রোগনির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার সরকারী ব্যবস্থাপনা, স্থানীয়স্তরে গণ-উদ্যোগ এবং যথাযথ পুর ও পঞ্চায়েত পরিষেবা নিশ্চিত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম জরুরী।