ওমিক্রন

Dr. Subrana Goswami

শতবর্ষ আগের স্প্যানিশ ফ্লু প্যান্ডেমিক ইতিহাসে ভয়ঙ্করতম অতিমারি ছিল, যেখানে বিশ্বের দু’শো কোটি জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ আক্রান্ত হয়েছিল, আনুমানিক পাঁচ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে এক দেশ থেকে অন্যদেশে সেনা চলাচলের মাধ্যমেই ফ্লু এত ছড়িয়েছিল। তুলনায় কোভিড এখনো শিশু। আটশো কোটি জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ত্রিশ কোটি আক্রান্ত, আধ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তবে প্রায় চারশো কোটি মানুষ দুটো করে টীকা পেয়েছেন। একটা ন্যূনতম হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে গেলে অন্ততঃপক্ষে আরো তিনশো কোটি মানুষের টীকাকরণ দরকার ছিল। টীকাকরণের গতি এত শ্লথ হলে অবশ্য টীকাকরণের অর্থ থাকে না, কেননা এক্ষেত্রে বুস্টার ডোজ না দিলে ইমিউনিটি বেশীদিন স্থায়ী হয় না। অল্প সময়ের ব্যবধানে সাতশো কোটির বেশী মানুষকে টীকা দিয়ে ফেলতে পারলেই তৃতীয় তরঙ্গকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হত। কিন্তু টীকাকে কেন্দ্র করে ধনতন্ত্রের মুনাফার লোভ তা করতে দেয়নি। ফলে তৃতীয় তরঙ্গ প্রত্যাশিতই ছিল। এখন দেখার বিষয়, চলতি অতিমারী কি শেষ অব্দি স্প্যানিশ ফ্লু প্যান্ডেমিকের ব্যাপ্তিকে অতিক্রম করে থামবে, নাকি বিজ্ঞানের অগ্রগতির সুফল যে টীকা, তাকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করে তার আগেই অতিমারীকে রুখে দেওয়া যাবে।

আমাদের দেশে এই যে তৃতীয় তরঙ্গ আছড়ে পড়েছে, সেটা যে শুধুমাত্র ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্টের জন্যই, তা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। কারণ, প্রথমতঃ, আমাদের জিনোম সিকোয়েন্সিং খুবই কম হয়, দ্বিতীয়তঃ, যেটুকু হয় তার তথ্য প্রকাশ করে না কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার। দ্বিতীয় তরঙ্গের জন্য দায়ী ডেল্টা ভ্যারিয়্যান্ট এখনো পশ্চিমবঙ্গে বহাল তবিয়তে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, তবে ওমিক্রন ভ্যারিয়্যান্ট দ্রুত তার জায়গা নিচ্ছে। প্রশাসনিক অবিমৃশ্যকারিতার ফলে কোলকাতা পুরসভা নির্বাচন, বিজয়োৎসব, বড়দিনের উৎসব, বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের ভিড়, চড়ুইভাতি, মেলা-খেলা-কম্বল বিতরন ইত্যকার নানান সমাবেশে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল ডেল্টা, ওমিক্রন দুটোই।

দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ওমিক্রনের তরঙ্গ দ্রুত শীর্ষে উঠে আবার দ্রুত নেমে আসতে দেখা গেছে। অবশ্য দেশগুলোর জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত হস্তক্ষেপ তা নিশ্চিত করেছে। আমাদের এখানেও তাই হতে চলেছে কিনা, তা নির্ভর করবে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত হস্তক্ষেপ কিরকম হবে তার উপর। আমাদের দেশে ও রাজ্যে এখন জনস্বাস্থ্যের সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক ভাবেই নেওয়া হয়। ফলে জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে কোন পূর্বাভাস করা সম্ভবপর হয় না।

ডেল্টা বা ওমিক্রন যাতেই আক্রান্ত হোন না কেন, যাদের দুটো করে টীকা নেওয়া আছে, তাদের দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার সময় থেকে এখনো ন’মাস অতিক্রান্ত না হলে বাড়াবাড়ির আশঙ্কা কম। যাদের একটাও টীকা নেওয়া নেই, বা মাত্র একটাই ডোজ নেওয়া আছে, এবং যারা ন’মাসেরও আগে দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন, তাঁরা ডেল্টা দ্বারা আক্রান্ত হলে বাড়াবাড়ির সম্ভাবনা বেশী থাকবে, কিন্তু ওমিক্রন দ্বারা আক্রান্ত হলে অতটা বিপদ নেই। অবশ্য বেশী বয়স্ক মানুষ ও যাঁদের কোভর্বিডিটি আছে, তাঁদের ওমিক্রনেও বাড়তি ঝুঁকি থাকবেই।

এখনকার আবহাওয়ায় সাধারণ সর্দি-কাশি, ফ্লু এসবও বাড়ছে। আপনি বুঝবেন কিভাবে আপনার ঠিক কোনটা হয়েছে? সাধারণভাবে সব সর্দি-কাশি-জ্বর-মাথাব্যথা-গাত্রব্যথাকেই সম্ভাব্য কোভিড বলে ভাবতে হবে, যতক্ষণ না পরীক্ষা করে নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। কিছুক্ষেত্রে অবশ্য ফলস্ নেগেটিভ রিপোর্টও আসে, বিশেষতঃ র‌্যাপিড কিটে পরীক্ষা করালে। উপসর্গ থাকলেও র‌্যাপিড কিটে নেগেটিভ রিপোর্ট এলে আরটিপিসিআর টেস্ট করাতে হবে।

তবে আপনার যাই হোক না কেন, সবগুলো ক্ষেত্রে প্রথম সপ্তাহে চিকিৎসা প্রায় একই। জ্বর এলে প্রতি কেজি ওজনপিছু ১.৫ মিলিগ্রাম হিসেবে প্যারাসেটামল সারাদিনে সর্বোচ্চ চারবার খেতে হবে, অন্ততঃ তিন থেকে চারদিন। সঙ্গে হাঁচি-সর্দি হলে অ্যান্টি-অ্যালার্জিক, শুকনো কাশি হলে বা গলাব্যথা করলে দিনে দু-তিনবার গলায় গরম জলের ভাঁপ ও গরম নুন-জলে কুলকুচি আরাম দেয়। ভিটামিন সি ও বি কমপ্লেক্স খাওয়া যেতে পারে, তবে অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়াই ভালো। মুড়িমুড়কির মত মুঠো মুঠো অ্যাজিথ্রোমাইসিন বা অন্য কোন অ্যান্টিবায়োটিকের কোন ভূমিকা নেই এতে, বরং এগুলো শরীরকে আরো দুর্বল করে দেবে। যেটা জরুরী, তা হল প্রথম দিন থেকে এবেলা-ওবেলা শরীরের অক্সিজেন সম্পৃক্তির মাত্রা, তাপমাত্রা, সম্ভব হলে রক্তচাপ, মিনিটে নাড়ির গতি, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার মেপে লিখে রাখা। একবার অক্সিজেনের মাত্রা দেখার পর ঘড়ি ধরে ছয় মিনিট হেঁটে আরেকবার তা পরখ করতে হবে। হাঁটার আগের চেয়ে পরে অক্সিজেনের মাত্রা চার-পাঁচ শতাংশ নেমে গেলে তা অশনিসংকেত। উপসর্গ দেখা দেবার দিন থেকে পাঁচ-ছ’দিন পরেও সেগুলো থেকে গেলে রক্তপরীক্ষা করে দেখা দরকার সাইটোকাইন ঝড় উঠতে চলেছে কিনা। যদি ওঠে, চিকিৎসকের পরামর্শমত স্টেরয়েড, অক্সিজেন ও অ্যান্টিকোঅ্যাগুল্যান্ট জাতীয় ওষুধ নিতে হবে বা হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। বাড়িতে অক্সিজেন দিয়ে বিশেষ লাভ হয় না। কারণ কোভিডে উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন দিতে হয়, যা বাড়িতে দেওয়া সম্ভব হয় না।

মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি বা মলনুপিরাভির জাতীয় অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কিছু কাজে দেয়, তাও একেবারে সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে প্রয়োগ করলে। ওমিক্রনে এগুলোর কোন কার্যকারিতা নেই। তাছাড়া এই ওষুধগুলোর মারাত্মক কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। ফলে বর্জনীয়। তবু গতসপ্তাহে প্রকাশিত এরাজ্যের সরকারী প্রোটোকলে এই ওষুধগুলো স্থান পেয়েছিল। সমালোচনার ঝড় উঠলে অবশ্য তড়িঘড়ি প্রোটোকল থেকে এগুলো বাদ্যদেওয়া হয়। বহুজাতিক ফার্মা সেক্টর এই আকালেও বিপুল মুনাফা বাড়িয়ে চলেছে। ভারতের ফার্মা মার্কেটের গ্রোথ রেট কোভিডের দ্বিতীয় তরঙ্গের শুরুতে, অর্থাৎ এপ্রিলে ছিল ৫১.৫ শতাংশ। এই সেক্টরে বার্ষিক টার্নওভার ১.৫ ট্রিলিয়ন কোটি টাকার। ধনতান্ত্রিক দুনিয়ায় চিকিৎসার প্রোটোকল বিজ্ঞান ঠিক করেৎদেয় না, বরং মুনাফাসর্বস্ব পূঁজিই চালকের, নিয়ন্ত্রকের আসনে। আর এই দেশে, এই রাজ্যে তো ধান্দার ধনতন্ত্রের রমরমা!

ইউরোপ-আমেরিকাতেও কয়েকটি দেশের দেখাদেখি সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার কোভিড আক্রান্তদের গৃহবাস কমিয়ে সাতদিন বলে ঘোষণা করেছে। অথচ এর পিছনে কী বিজ্ঞান তা কারো জানা নেই। উপসর্গ দেখা দেবার দিন থেকে আট-নয় দিন অব্দি ভাইরাস শরীরে সক্রিয় থাকতে পারে, আক্রান্ত ব্যক্তি সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সরকার কি চাইছে এভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে তা বুস্টার ডোজের কাজ করুক? টীকার বদলে আরো প্রাণের বিনিময়ে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে? নাকি পূঁজির সংকট লাঘব করতে এই সিদ্ধান্ত? শ্রমিক-কর্মচারীর বেশী বিশ্রামে শ্রমদিবস যাতে ‘নষ্ট’ না হয়, উৎপাদন যাতে অব্যাহত থাকে, সেদিকে তাকিয়ে এই সিদ্ধান্ত?

বিশ্বজুড়ে রব উঠেছে, ওমিক্রন নাকি প্রাকৃতিক বুস্টার ডোজ, এটাই নাকি অতিমারীর শেষের সূচনা। বিবর্তনের বিজ্ঞান অবশ্য বলে, ওমিক্রন যত বেশী ছড়াচ্ছে, ততই নতুন মিউটেশনের সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাচ্ছে। তবে একথাও ঠিক যে আগামী ভ্যারিয়্যান্টগুলো আর খুব বেশী প্রাণঘাতী হবে না, বরং আরো বেশী সংক্রামক হতে পারে। ফলে সংক্রমণ প্রতিরোধই নতুন মিউটেশন ঠেকানোর একমাত্র রাস্তা। প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে শ্রেয়তর – কথাটি বহুব্যবহৃত ও ক্লিশে হয়ে গেলেও সত্যি। পানশালা, শপিং মল, সিনেমা হল খুলে রেখে স্কুল কলেজ বন্ধ করা ও গঙ্গাসাগর মেলায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার অর্থ গোষ্ঠীসংক্রমণ ডেকে আনা।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের টীকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে গত ফেব্রুয়ারী-মার্চে, পুলিশ ও অন্য সামনের সারির কোভিড যোদ্ধাদেরও মার্চ-এপ্রিলে দ্বিতীয় ডোজ  দেওয়া হয়েছে। ন’মাস অতিক্রান্ত নভেম্বরেই। দেশ ও রাজ্যের সরকার আমাদের দাবীতে কর্ণপাত করে ঐসময় বুস্টার ডোজ দিলে আজ এত চিকিৎসক,স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ আক্রান্ত হত না। রাজ্যজুড়ে সহস্রাধিক চিকিৎসক, আরো বেশী স্বাস্থ্যকর্মী ও পুলিশ আক্রান্ত। আগামী সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তির হার বাড়বেই, ততদিনে হাসপাতালে পরিষেবা দেবার মত কেউ থাকবে কিনা কে বলতে পারে! ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সংখ্যা নগন্য। দীর্ঘদিন নিয়োগ না হওয়ায় এমনিতেই শূণ্যপদ প্রচুর। তার উপর বাহিনীর বড় অংশ কোভিড আক্রান্ত।

রাষ্ট্র ও সরকার এভাবে হাত গুটিয়ে নিলে জনগণকেই নিজের হাতে দায়িত্ব তুলে নিতে হয়। তাই রাস্তা আপাততঃ জনসমাবেশ থেকে বিরত থাকা, বদ্ধ ঘরে ভীড় না করা, মাস্ক পড়া, হাত ধোওয়া ও টীকা নেওয়া। পাড়ায় পাড়ায় রেড ভলান্টিয়ার্স তৈরী, এএইচএসডি ও এসএফআই-এর টেলিমেডিসিন টীম প্রস্তুত। আতঙ্কিত নয়, সতর্ক থাকুন।