-ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী
অপুষ্টি বলতে আমরা যা বুঝি তার মধ্যে অপর্যাপ্ত খাদ্যগ্রহণজনিত ক্ষয়, বামনত্ব, ওজন কমে যাওয়া, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের অভাব যেমন পড়ে, আবার ওজন বেড়ে যাওয়া, স্থূলত্ব এবং খাদ্য-জনিত অসংক্রামক রোগ-ব্যাধিও পড়ে। খাদ্যগ্রহণের ফলে আমাদের শরীর যে শক্তি ও পরিপোষক পায়, তার ঘাটতি, বাহুল্য বা ভারসাম্যহীনতা – যে কোনটা ঘটলেই অপুষ্টি দেখা দেয়। সুতরাং অপুষ্টির বর্ণচ্ছটাকে মোটামুটি তিনটে বড় ভাগে ভাগ করা যায় –
(এক) ঊণপুষ্টি – এর মধ্যে আবার বয়স, ওজন ও উচ্চতার পারস্পরিক সম্পর্ক অনুযায়ী তিনটে আলাদা আলাদা ধরণ হয় – (ক) যাদের পেশী ক্ষয়প্রাপ্ত, অর্থাৎ উচ্চতার নিরীখে যাদের ওজন কম, (খ) বামনত্ব, অর্থাৎ যাদের বয়স অনুপাতে উচ্চতা খুবই কম, (গ) যাদের বয়স অনুপাতে ওজন কম।
পেশী-ক্ষয় হয় কেবলমাত্র সাম্প্রতিক তীব্র ঊনপুষ্টির দরুন, আর তার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ক্রমাগত ঊনপুষ্টির যোগফল হল বামনত্ব।
(দুই) মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট অর্থাৎ ভিটামিন বা খনিজ পদার্থ অথবা উভয়েরই হয় অভাব, নয় আধিক্য। এটা আলাদাভাবেও দেখা দিতে পারে, আবার ঊনপুষ্টি, অধিকপুষ্টি – উভয়ক্ষেত্রেই এই অভাব বা আধিক্য দেখা দিতে পারে।
(তিন) অধিকপুষ্টি – বেশী ওজন, স্থূলত্ব এবং খাদ্য-সম্পর্কিত অসংক্রামক রোগবালাই – যেমন হার্টের রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ইত্যাদি ও কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্যান্সার।
ভারতের জাতীয় পুষ্টি সমীক্ষা ২০১৬-‘১৮-তে তথ্য উঠে আসে, অনুর্ধ্ব পাঁচ বছর শিশুদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ বামনত্বে ও ১৭ শতাংশ পেশী-ক্ষয়ে ভুগছে। ২০১৯-২০২০ সালের জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার রিপোর্টে উঠে এসেছে ভারতীয় মহিলা ও শিশুদের অর্ধেকের বেশী অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতায় ভুগছে। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও সমীক্ষা চালানো ২২-টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ১৫-টিতেই, অর্থাৎ কেরালা ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো বাদে দেশের প্রায় সর্বত্র এই চিত্র। লাদাখ, জম্মু-কাশ্মীর, গুজরাত ও পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা। লাদাখে ৯২.৫ শতাংশ শিশু ও ৯২.৮ শতাংশ মহিলা এবং হিমাচলের লাউল-স্পিতি জেলায় ৯১ শতাংশ শিশু ও ৮২ শতাংশ মহিলা রক্তাল্পতায় ভুগছে। লিঙ্গবৈষম্যের জ্বলন্ত প্রমাণ রেখে পুরুষদের মধ্যে রক্তাল্পতার হার সর্বত্রই মহিলাদের তুলনায় কম, অধিকাংশ রাজ্যেই ৩০ শতাংশের নীচে। কেবলমাত্র মহিলাদের মাসিক ঋতুস্রাব ও প্রসবকালীন রক্তক্ষয় দিয়ে এই বিরাট ব্যবধান ব্যাখ্যা করা যাবে না। এদেশে শিশু, মহিলা, পুরুষ – সব ক্ষেত্রেই রক্তাল্পতার মূল কারণ আয়রন ও ভিটামিন বি১২-র অভাব, কিছুক্ষেত্রে ফলিক অ্যাসিডের অভাব। এই অভাবের পিছনে রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্যের তথা সঠিক পুষ্টির অভাব, বিশেষতঃ মিলেট-জাতীয় খাদ্য, তরতাজা সবজে শাকসব্জী, ফলমূল ইত্যাদি খেতে না পাওয়া ও তার বদলে পুষ্টিমানে দুর্বল প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াকৃত খাদ্য গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত পোষণ ট্র্যাকার অ্যাপের তথ্য অনুযায়ী এবছর অক্টোবর অব্দি ৩৩ লক্ষেরও বেশী শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, যার মধ্যে পৌনে আঠারো লক্ষ অতি অপুষ্টিতে ভুগছে। মহারাষ্ট্রে সর্বাধিক, বিহারে দ্বিতীয় ও গুজরাতে তৃতীয় সর্বাধিক। এরাজ্যেও ২০১৫-’১৬-র তুলনায় বামনত্ব বেড়েছে ৩ শতাংশ।
গত মাসে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের রিপোর্ট বেরোল। কী এই ক্ষুধা সূচক? ঊণপুষ্টি, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বামনত্ব, পেশী-ক্ষয় ও মৃত্যুহার – এই চারটে সূচকের যৌগিক সমাহার। সারাবিশ্বের নিরীখে ক্ষুধা সূচক সবচেয়ে বেশী, অর্থাৎ সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সোমালিয়ার (স্কোর ৫০.৮), তারপর ইয়েমেন (৪৫.১), সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক (৪৩), চাড (৩৯.৬), কঙ্গো (৩৯), ম্যাডাগাস্কার (৩৬.৩)। আমাদের দেশের স্কোর ২৭.৫, যেখানে আমাদের প্রতিবেশীরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় রয়েছে – চীন (৫-এর নীচে), বাংলাদেশ (১৯.১), পাকিস্তান (২৪.৭), নেপাল (১৯.১), শ্রীলঙ্কা (১৬)। ক্ষুধা সূচকের চারটে উপসূচকের মধ্যে একটা সূচক সবকটা দেশের মধ্যে ভারতে সর্বাধিক, পাঁচ বছরের নীচে শিশুদের পেশী-ক্ষয় (১৭.৩%)। পেশী-ক্ষয় মানে হল উচ্চতা অনুপাতে কম ওজন, অর্থাৎ সম্প্রতি তীব্র অপুষ্টির দরুন ওজন কমেছে। এই সূচক ইয়েমেনে ১৫.১%, সোমালিয়ায় ১৩.১%। অর্থাৎ শতাংশের হিসেবে সোমালিয়া, ইয়েমেনের চেয়েও এদেশে সম্প্রতি তীব্র অপুষ্টির দরুন বেশী শিশুর ওজন কমছে। আফ্রিকার দেশগুলো নাহয় নানারকম সংঘর্ষে ক্লিষ্ট, তাদের জিডিপি-র বৃদ্ধি কম, অনেক কারণ আছে, কিন্তু ট্রিলিয়ন ডলারের ইকনমি আর ৮% জিডিপি গ্রোথের খোয়াব দেখানো, আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত, পরমাণু শক্তিধর আমাদের দেশ, যে দেশ থেকে ফোর্বস ম্যাগাজিনে নাম তোলা মাল্টি-বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলে, যে দেশ আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ করে স্ট্যাচু অব ইউনিটি বানাতে পারে, প্যান্ডেমিকের মাঝে তেরো হাজার কোটি টাকার সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্প হাতে নিতে পারে, সে দেশ তার ছোট ছোট শিশুদের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে পারে না।
কার্ল মার্ক্স তাঁর ‘গ্রুন্ড্রিসে : ফাউন্ডেশনস অব দ্য ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকনমি’ গ্রন্থে আদিম মানুষ থেকে আধুনিক যুগের মানুষের উৎপাদন প্রণালীর ঐতিহাসিক বিবর্তনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ খাদ্যগ্রহণের রীতির বিবর্তন তুলনা করে লিখেছেন, ‘যে খিদের নিবৃত্তি হয় ছুরি ও কাঁটাচামচ সহযোগে রান্না করা সুস্বাদু মাংস দিয়ে, আর যে খিদেয় কোনক্রমে নখ, হাত আর দাঁত দিয়ে কাঁচা মাংস ছিঁড়ে গবগব করে গলাধঃকরণ করতে হয়, দুটো কোনভাবে এক নয়। উৎপাদন শুধু সামগ্রী উৎপন্ন করে না, ভোগের রীতিও ঠিক করে দেয় – কেবলমাত্র বস্তুগতভাবেই নয়, বিষয়ীগতভাবেও। এভাবেই উৎপাদন ভোক্তার জন্ম দেয়। উৎপাদন শুধু প্রয়োজনের সামগ্রীই উৎপন্ন করে না, সামগ্রীর প্রয়োজনও পয়দা করে।’ পূঁজিবাদী খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া শুধু বর্ধিত খাদ্যসামগ্রীই উৎপাদিত করছে না, সেই সামগ্রীর প্রয়োজন ও ক্রমবর্ধমান বাজারও তৈরী করছে। সেই বাজারে প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়, ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে ঠিক হয় কে কতটা খেতে পাবে।
অক্সফ্যামের রিপোর্ট বলছে বিশ্বের জনবিন্যাসের নীচের ৫০ শতাংশের অর্থাৎ সবচেয়ে গরীব অংশের মোট সম্পত্তির সমান সম্পত্তি রয়েছে বিশ্বের ধনীতম ২৬ জন ব্যক্তির হাতে। শুধু তাই নয়, তাদের রিপোর্টে এটাও দেখা যাচ্ছে যেখানে সম্প্রতি বিশ্বের ২২০০ জন বিলিয়নেয়ারের সম্পত্তি বেড়েছে ১২ শতাংশ, সেখানে ঐ ৫০ শতাংশের অর্থাৎ গরীব মানুষের সম্পদ কমেছে ১১ শতাংশ। ক্রেডিট সুইস বলে আর একটা রিপোর্ট বেরোয়, সেখানে দেখা যাচ্ছে সারা বিশ্বের মোট সম্পদের অর্ধেক গচ্ছিত রয়েছে মাত্র এক শতাংশ ধনী মানুষের কব্জায়। ইন্ডিয়া ইনফোলাইন লিমিটেড ওয়েলথ হারুন ইন্ডিয়া ভারতীয় ধনীদের যে তালিকা সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে ভারত তথা এশিয়ার ধনীতম ব্যক্তি মুকেশ আম্বানীর সম্পদ এখন ৭,১৮,০০০ কোটি টাকা। অনেককে পিছনে ফেলে এশিয়ার দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা গৌতম আদানী গত একবছরে দৈনিক ১০০২ কোটি টাকা করে আয় করেছেন এবং গত এক বছরে তাঁর সম্পদ ১,৪০,২০০ কোটি টাকা থেকে প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়ে ৫,০৫,৯০০ কোটি টাকা হয়েছে। তাঁর ভাই বিনোদ শান্তিলাল আদানীর সম্পদ বেড়ে হয়েছে ১,৩১,৬০০ কোটি টাকা। গত একবছরে ভারতের তৃতীয় ধনী ব্যক্তি শিব নাদারের সম্পদ বেড়েছে ৬৭ শতাংশ (ছাপার ভুল নয়, সাতষট্টি শতাংশ বৃদ্ধি), পঞ্চম ধনী লক্ষী মিত্তালের সম্পদ এই এক বছরে বেড়েছে ১৮৭ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় তিনগুণ। ১,৬৩,০০০ কোটি টাকার মালিক সেরাম ইন্টিটিউটের কর্ণধার সাইরাস পুনাওয়ালা ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছেন।
ধান, গম, আখ, বাদাম, ফল ও সব্জী উৎপাদনে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। সারা পৃথিবীর মোট ডালশস্য উৎপাদনের এক চতুর্থাংশ উৎপন্ন হয় এদেশেই। ইকনমিক সার্ভে অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে ২০১৯-এ ২৮৫.২১ মিলিয়ন টন ও ২০২০-তে ২৯৬.৬৫ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল, ২০২১-এ হয়েছে ৩০৩.৩৪ মিলিয়ন টন। ২০২২-এ ৩০৭.৩১ মিলিয়ন টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। গতবছর ৫৩৫.৭৮ মিলিয়ন খাদ্যযোগ্য প্রাণীসম্পদ উৎপাদন হয়েছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। দুগ্ধ উৎপাদন ২০২০-তে ছিল ১৯৮ মেট্রিক টন, ২০২১-এ তা ২০৮ মেট্রিক টনে পৌঁছবে বলে আশা।
একদিকে দেখা যাচ্ছে গত দু’বছরে ভারতে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ২.২ শতাংশ, অন্যদিকে রেস্তোঁরার খাবার সরবরাহকারী সংস্থা জোম্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা আটত্রিশ বছর বয়সী দীপিন্দার গোয়েলের সম্পদ ১৬৪ শতাংশ বেড়ে ৫৮০০ কোটি টাকা হয়েছে গত এক বছরে। একদিকে ক্ষুধা সূচকে ১২৭-টা দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১০১-তম, অন্যদিকে ২০১৬ সাল থেকে আজ অব্দি টানা ছ’বছর ধরে বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় ভারত সর্বোচ্চ পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুত করে আসছে। ফুড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া এবছর মে মাস অব্দি চাল ও গম মিলিয়ে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুত করেছে – ৮৫০.৩ মেট্রিক টন। এর বাইরেও আরো ২৬০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করেছে তারা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে মোট ১০০০ মেট্রিক টনের বেশী। ২০১৬-তে এই হিসেব ছিল ৫২৭.৯ মেট্রিক টন, ২০১৭-তে ৫২৪ মেট্রিক টন, ২০১৮-তে ৬০৭ মেট্রিক টন, ২০১৯ ও ২০২০-তে ৬৪২ মেট্রিক টন করে।
গত জুলাই মাসে ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন সারাবিশ্বের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার হালহকিকতের সালতামামি পেশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ক্ষুধার্ত জনসংখ্যা ভারতেই সর্বোচ্চ। দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের ফাটলটা ক্রমশঃ চওড়া হচ্ছিলই, কর্মহীনতা বাড়ছিলই, গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিল অপরিকল্পিত লকডাউন। লাখো লাখো কাজ হারানো পরিযায়ী শ্রমিক প্রাণ হাতে করে কোনক্রমে ঘরে ফিরে পেটে কিল মেরে বসে থাকতে বাধ্য হল।
হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য এফসিআইয়ের গোলায় মজুত থাকতেও দেশের গণবন্টন ব্যবস্থার আওতায় এসেছে মাত্র ৬০ শতাংশ মানুষ। সর্বজনীন গণবন্টন ব্যবস্থা তুলে দিয়ে এই ৮০-৮৫ কোটি মানুষকে চাঁদমারী ধরে নিয়ে একটা আংশিক গণবন্টন ব্যবস্থা খাড়া করা হয়েছে জাতীয় খাদ্যসুরক্ষা আইনে, যার আওতার বাইরে পড়ে রইল বিপুল সংখ্যক গরীব মানুষ। আইনে বলা হয়েছিল ৬৭ শতাংশ মানুষকে এর চৌহদ্দিতে আনা হবে, কিন্তু হিসেবের ভিত্তি ছিল ২০১১ সালের আদমশুমারি। গত এক দশকের জনস্ফীতিকে হিসেবে ধরলে ঐ শতাংশ নেমে আসে ৬০-এ। লকডাউনে চাল-গমের বরাদ্দ দ্বিগুণ করার ঘোষণাই সার, কার্যক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী গরীব কল্যাণ যোজনার এই বাড়তি বরাদ্দ হাতে পায়নি জাতীয় খাদ্যসুরক্ষা আইনের উপভোক্তাদের একটা বড় অংশ। সরকারী তথ্যেই দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী গরীব কল্যাণ যোজনায় বন্টিত খাদ্যশস্যের পরিমাণ জাতীয় খাদ্যসুরক্ষা আইনে বন্টিত খাদ্যশস্যের চেয়ে অনেক কম। লকডাউনের আগে পরিযায়ী ও স্থানীয় শ্রমিকদের একটা বড় অংশের হাতে কাজ ছিল, পেটে ভাত ছিল। সেসময় তাঁরা জাতীয় খাদ্যসুরক্ষা আইনে রেশন কার্ড করার মানদন্ডের উপরে ছিলেন, ফলে তাঁরা কার্ড পাননি। লকডাউনে যখন তাঁরা কাজ হারালেন, পেটে টান পড়ল তাঁদের, তখন তাদের রেশন দরকার হয়ে পড়ল। অথচ সরকার কার্ড ছাড়া রেশন দিল না, নতুন কার্ডও বানিয়ে দিল না। আবার যেসব পরিযায়ী শ্রমিক কাজ হারালেন, কিন্তু বাড়ি ফিরতে পারলেন না, কাজের জায়গাতেই আটকে পড়লেন, তাঁরাও রেশন পেলেন না। সরকার এইসময় ‘এক দেশ, এক রেশন’ নীতি ঘোষণা করলেও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও ডিজিট্যাল রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার সংযুক্তিকরণ, রেশন দোকানে কার্ড পাঞ্চিংয়ের জন্য ‘পয়েন্ট অব সেল মেশিন’ ইত্যাদি প্রযুক্তিগত নানা ফ্যাঁকড়ায় তা লাগু হয়নি। এফসিআইয়ের গুদামে যখন হাজার মেট্রিক টন শস্য পচছে, তখন অন্ততঃপক্ষে ভর্তুকি দিয়ে স্বল্পমূল্যে যদি খাদ্যশস্য বিক্রীও করা হত রেশন দোকান থেকে, তাহলে যাদের কার্ড নেই, অথচ লকডাউনে রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে সেই পরিবারগুলোর ক্ষুধানিবৃত্তি হতে পারত। তা না করে সরকার এফসিআইয়ের গুদামে আরো ৩২ মেট্রিক টন শস্য মজুত করল কোভিডের দ্বিতীয় তরঙ্গের সময়।
শিশুদের অপুষ্টি রোখার অন্যতম উপায় তাদের স্কুলের মিড-ডে মিল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের রান্না করা খাবার সরবরাহ। মিড-ডে মিল থেকে প্রতিটা শিশুর চব্বিশ ঘন্টায় যত ক্যালরি প্রয়োজন হয় তার এক তৃতীয়াংশ ও দৈনিক মোট প্রয়োজনীয় প্রোটিনের অর্ধেক পাবার কথা। ভারতবর্ষের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চল ও গ্রামে কোন কোভিড রোগী ছিল না অন্ততঃ দ্বিতীয় তরঙ্গের আগে অব্দি। অথচ সারা দেশের সমস্ত অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, সমস্ত স্কুল বন্ধ রাখা হল বছরভ’র। ফলে শুধু শিশুরা ও কিশোরী মেয়েরাই নয়, পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হল সন্তানসম্ভবা ও স্তন্যদাত্রী মায়েরাও, যাদের এসময় বাড়তি পুষ্টির প্রয়োজন হয় এবং তা মেটানোর কথা আইসিডিএস প্রকল্পের মাধ্যমে। যেখানে যেটুকু খাদ্যশস্য বন্টনের জন্য সরবরাহ করা হল তা প্রকৃত প্রাপকদের হাতে পৌঁছল কিনা, তা খতিয়ে দেখার, নজর রাখার কোন কার্যকরী ব্যবস্থা না থাকায় শাসকদলের স্থানীয় নেতা, মোড়ল-মাতব্বরদের জিম্মায় চলে গেল একটা বড় অংশের খাদ্যশস্য। এরাজ্যে এধরণের বহু ঘটনা খবরে উঠে এসেছে।
পশ্চিমী সুপারমার্কেট ও ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিগুলোর হাতে সমস্ত তথ্য ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত এবং তারা তাদের বাণিজ্য-সাম্রাজ্য প্রসারের লক্ষ্যে সেই সাম্রাজ্যবাদী পুষ্টি-জ্ঞাণ বিতরণের মাধ্যমে দক্ষিণ গোলার্ধের খাদ্য উৎপাদনকে প্রভাবিত করছে। পুষ্টিবিজ্ঞানকে সমাজবিজ্ঞাণ থেকে ছিন্ন করে, রাজনৈতিক অর্থনীতি থেকে দূরে সরিয়ে, একটা স্বতন্ত্র বায়োমেডিক্যাল প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে। পুষ্টির দায়-দায়িত্ব ব্যক্তিগত বলে হাজির করানো হচ্ছে। অথচ ব্যক্তির জৈবিক প্রয়োজন ও তার সামাজিক জোগানের আন্তঃসম্পর্কই আমাদের স্বাস্থ্যের প্রধান নিয়ামক। এই দুটোর কোনটাকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখব আমরা, ব্যক্তিকে, নাকি যে সমাজ ব্যবস্থায় সে বসবাস করে, তাকে? সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টি-অপুষ্টির ন্যারেটিভ খাড়া করবার চেষ্টা করছে কর্পোরেট দুনিয়া তথা ধনতন্ত্র। অবশ্য এই চেষ্টা আজকের নয়, ১৯৩০-এর দশকে বিশ্ব পূঁজিবাদ যখন চরম সংকটে পড়েছিল, অর্থাৎ ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর সময়, একদিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদনে বাজার সম্পৃক্ত, অন্যদিকে ভোক্তাদের তা কিনে খাবার স্বাচ্ছল্য নেই – এই ব্যবধান কেন হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে ‘লীগ অব নেশনস্ হেলথ অর্গানাইজেশন’ মাঠে নামে। তাদের সমীক্ষায় উঠে আসে ধনতান্ত্রিক আর্থসামাজিক রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে ক্ষুধা ও অপুষ্টির সরাসরি, প্রত্যক্ষ যোগসূত্রের আকাট্য প্রমাণ। রাজনৈতিক প্রভূদের চাপে সেই রিপোর্ট তড়িঘড়ি বদলে ফেলে অপুষ্টির কারণ হিসেবে ব্যক্তিমানুষের ভ্রান্ত খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করে নতুন রিপোর্ট পেশ করতে বাধ্য হয় তারা। এভাবেই খাদ্য ও পুষ্টির পৃথকীকরণ ক্ষুধার বাস্তব কাঠামোগত নির্ধারকগুলোকেই অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে করে দিতে শুরু করে।
কৃষিজ পণ্য রপ্তানীর নিরীখে পৃথিবীর প্রথম ১৫-টা দেশের মধ্যে পড়ে ভারত। টাকার মূল্যে রপ্তানীর পরিমাণ ২০১৯-এ ছিল ৩৮.৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২০-তে অতিমারির জন্য একটু কমে হয়েছে ৩৫.০৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আইএনসি৪২-এর রিপোর্ট, ২০২৫-এর মধ্যে ভারতীয় কৃষিবাজার আরো অন্ততঃ ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পাবে। এই বাজারে বেসরকারী ক্ষেত্রের অংশীদারিত্ব ২০১৭-তে ছিল ৫৭.৩৮ শতাংশ, ২০২১-এ বেড়ে হয়েছে ৬৪.৪৬ শতাংশ। ২০২০-তে ভারতে ২৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার ছিল প্যাকেটজাত, প্রক্রিয়াকৃত খাদ্যের, ২০২৫-এ তা ৪৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছবে বলে শিল্পমহলের আশা। এই আশার ভিত্তি হল ‘ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস্’ ব্যবসায় সরকারের ১০০ শতাংশ সরাসরি বিদেশী নিয়োগের অনুমতি।
২০২০-২১ অর্থবর্ষে ভারত প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানী করেছে ৪৩,৭৯৮ কোটি টাকার। এর মধ্যে আছে ডাল, প্রক্রিয়াকৃত সব্জী, ফল ও ফলের রস, বেসন, বাদাম, পেষাই করা শস্য, তেল ও মদ। কেন্দ্রীয় শিল্প ও আভ্যন্তরীন বাণিজ্য দপ্তরের হিসেব অনুযায়ী ২০০০ সালের শেষ ন’মাসে এই শিল্পে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে ১০.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত দুবছরের মধ্যে নেসলে গুজরাটে তাদের নবম কারখানা তৈরী করছে ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে, হলদিরাম অ্যামাজনের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে তাদের নোনতা খাবার বিক্রীর জন্য, কোকা-কোলা ‘রানী ফ্লোট’ নামে নতুন ফলের রসের ব্র্যান্ড চালু করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার ‘প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেন্টিভ স্কীম ফর ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি’ চালু করেছে, যার বাজেট বরাদ্দ ১.৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতের ‘ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস্’ বাজারে এখন বৃদ্ধির হার ১৪.৯ শতাংশ। ‘ফিচ সলিউসন্স’-এর রিপোর্ট, গেরস্থালির ব্যয় করবার ক্ষমতা অতিমারিতে হ্রাস পেয়েছে ৯.৩ শতাংশ, কিন্তু দাম বাড়িয়ে ক্ষতি উসুল করে নিয়েছে এই শিল্প, ফলে গ্রামীন ভারতেও এই ক্ষেত্রতে ১৪.৬ শতাংশ বৃদ্ধি বহাল আছে। ক্রিসিল রেটিংসের হিসেব, ২০২২-এ দ্বিগুণ রাজস্ব তুলে নেবে এই শিল্প। ভারতের প্রক্রিয়াকৃত খাদ্যের বাজার, গতবছর যা ছিল ২৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, ২০২৫-এ ৪৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর শিল্পমহল। জনসন এন্ড জনসন, আইটিসি, হিন্দুস্তান লিভার, ব্রিটানিয়া – এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মমার্থ, দ্য মমস, বে বী, আজাহ, নুয়ার মত স্টার্ট-আপ কোম্পানী। গত আগস্টে বেঙ্গালুরুর পাইকারী বাজার বি-টু-বি সেকোয়া ক্যাপিটালের সঙ্গে গাঁটছড়ায় ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল গড়েছে বিনিয়োগের জন্য, সিঙ্গাপুরের উইলমার কোম্পানীর সঙ্গে যৌথভাবে আদানী গ্রুপ ৪৫০০ কোটি টাকার আইপিও তুলেছে ব্যবসা সম্প্রসারনের জন্য। মারিও লিমিটেড, হিন্দুস্তান লিভার, ডাবর ইন্ডিয়া, আইটিসি ও গোদরেজ এবছরের প্রথম তিনমাসে মোট অনলাইন এফএমসিজি বিক্রীবাটার সিংহভাগের অংশীদার। জুন মাসে ডাবর ইন্ডিয়া ৫৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগে মধ্যপ্রদেশে আরো একটা প্ল্যান্ট খুলল, মে মাসে টাটা সন্সের টাটা ডিজিটাল লিমিটেড বিগ বাস্কেটের ৬৪.৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব কিনে নিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, নেপালের সিজি কর্প গ্লোবাল কোম্পানী ভারতে আরো দুটো ওয়াই ওয়াই নুডলসের কারখানা খুলছে ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করে। নেসলে ঘোষণা করেছে পাঁচ হাজারের উপরে জনসংখ্যা, ভারতের এমন সমস্ত গ্রামে তারা তাদের পণ্যসম্ভার নিয়ে পৌঁছে যাবে আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে। হলদিরামের সঙ্গে জোট বেঁধে আফ্রিকার ফিউচারলাইফ কোম্পানী ভারতের বাজারে ওটস, গ্র্যানোলা ইত্যাদির তৈরী স্ন্যাক্স নিয়ে আসছে। এই সমস্ত কোম্পানীর জন্য ভারত সরকার প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেন্টিভ চালু করেছে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ প্রকল্পে। প্যাকেটজাত, প্রক্রিয়াকৃত খাদ্যে জিএসটি ১২-১৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০-৫ শতাংশ করা হয়েছে।
খাদ্য ক্রমশঃ বেশী বেশী মুনাফা লোটার বস্তু হয়ে উঠছে, বাজার ধরার জন্য দেশী-বিদেশী পূঁজির কারবারীরা আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। সংগঠিত বৃহৎ শিল্পক্ষেত্রের হাতে বাজারের দখল চলে যাবার ফলে অসংগঠিত, ছোট-মাঝারি উৎপাদক ও ব্যবসাদাররা ক্রমশঃ কোণঠাসা হচ্ছে। ব্র্যান্ডেড প্যাকেটজাত, প্রক্রিয়াকৃত খাদ্যের প্রতি শহুরে ও গ্রামীণ উভয় ধরণের ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করতে একদিকে ব্র্যান্ডগুলো পৌঁছে যাচ্ছে শহরের বস্তি, মফঃসলের অলিগলি ও প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকানেও, অন্যদিকে অবৈজ্ঞানিক দাবীসহ বর্ণময় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্র্যান্ড-সচেতনতা নির্মাণ। এই দুই আগ্রাসী বিপণন কৌশল নিয়েছে কর্পোরেট হাউসগুলো। এর ফলে একদিকে এই প্রোডাক্টগুলো সেইসব খাদ্যবস্তুকে প্রতিস্থাপিত করছে, যেগুলো এযাবৎকাল অব্দি সস্তা, সহজলভ্য ও পুষ্টিকর ছিল, অন্যদিকে কৃষিক্ষেত্রে বেসরকারী থাবা পড়ায় সেইসব পুষ্টিকর খাদ্যবস্তুও আর সস্তা, সহজলভ্য থাকছে না। একদিকে অল্পবয়সীদের রঙীন, চকচকে ফুড প্রোডাক্ট, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ফুড পার্কে আকৃষ্ট করবার কৌশল, অন্যদিকে বেসরকারী কর্মক্ষেত্রে কাজের ন্যূনতম সময় ১০-১২ ঘন্টা, কখনো তারও বেশী হবার ফলে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির হাতে সব্জী কেটে, মশলা বেঁটে রান্না করবার সময় ও কর্মশক্তি অবশিষ্ট না থাকায় তাদের অনলাইনে ফাস্ট ফুড, প্রসেসড ফুড, রেডি-টু-ইট খাবার আনিয়ে খেতে কার্যতঃ বাধ্য করা – এই দুই কৌশলে বাজার বাড়িয়ে মুনাফা লুটছে ধনতন্ত্র। ভারতে অনলাইন এফএমসিজির বাজার ২০১৭-তে ছিল ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, ২০২০-তে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। একদিকে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র, অসাম্য, বেকারত্ব, মজুরি ও বেতনে কোপ অন্যদিকে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহকে লাভের ক্ষেত্রে পরিণত করায় দিন দিন, বেশী বেশী মানুষ যথেষ্ট পরিমাণে উন্নত গুনমানের পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পেরে ঊণপুষ্টিতে ভুগছেন। আর একদিকে ফাস্ট ফুড, এনার্জি ড্রিঙ্ক, হেলথ ড্রিঙ্ক, প্রসেসড্ ফুড, প্যাকেজড্ ফুড, রিফাইন্ড ফুড, হাই-ক্যালরি ফুডে অভ্যস্ত করিয়ে দিয়ে স্থূলত্ব ও তজ্জনিত উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, কিডনীর রোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সারের কবলে ফেলছে বেশী বেশী মানুষকে। সুতরাং এ কথা অত্যুক্তি হবে না যে যে অপুষ্টির প্রশস্ত বর্ণচ্ছটার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, স্পষ্টতঃই মুনাফাসর্বস্ব ধনতন্ত্র ও আগ্রাসী উদার অর্থনীতিতে চলা রাষ্ট্রের তথা সরকারের অবদান।
গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে একই জনগোষ্ঠীতে ঊণপুষ্টি ও স্থূলত্ব – দুইয়েরই দেখা মিলছে। ১৯৯০-এর আগে ভারতে এমন চিত্র ছিল না। গত তিন দশকে মুক্ত বাণিজ্য, স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম, মুনাফাসর্বস্ব উদার অর্থনীতির অন্যতম পরিণাম হল অপুষ্টির এই জোড়া ফলা। এই নীতির বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে, এই নীতির সমর্থক রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে পরাস্ত করতে না পারলে অপুষ্টি, রক্তাল্পতা আরো বাড়তেই থাকবে। চিকিৎসক খচখচ করে চারটে আয়রন বড়ি আর নেসলে-র বেবীফুড বা আইটিসির হেলথ ড্রিঙ্ক প্রেসক্রিপশনে লিখে দিয়ে অপুষ্টি ও রক্তাল্পতা সারিয়ে ফেলতে পারবেন না। বরং দরকার এই নীতি বদলের লক্ষ্যে ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা।
