Dr. Subrana Goswami
‘আমরা কি আবার এমন এক পৃথিবী কল্পনা করতে সক্ষম, যেখানে সবার জন্য কলুষহীন বাতাস, জল আর খাদ্য মিলবে? যেখানে অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকবে স্বাস্থ্য ও জনহিত? যেখানে নগর হবে বাসযোগ্য, মানুষের হাতে থাকবে তাদের আপন স্বাস্থ্যের ও এই গ্রহের স্বাস্থ্যের নিয়ন্ত্রণ?’ – এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষ্যে এই প্রশ্নগুলো রাখা হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে।
শিল্প বিপ্লবের পরে কিছু মানুষ নিজেকে সবকিছুরই মালিক বলে ভেবে নিয়ে মেশিন দিয়ে প্রকৃতিকে কাজে লাগাতে শুরু করল। তখন থেকেই কিছু মানুষের কার্যকলাপ এই গ্রহের জলবায়ু এবং বাস্তুতন্ত্রের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে শুরু করল। আইপিসিসি গতবছর তাদের ষষ্ঠ রিপোর্টে স্বীকার করেছে যে বায়ুমন্ডলে গ্রীন হাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়ে যে জলবায়ু সংকট তৈরী হয়েছে, নিঃসন্দেহে মানুষের কাজকর্মই তার জন্য দায়ী। শিল্পবিপ্লবের আগের ১১৭০০ বছরকে হলোসিন, আর তার পরের পর্যায়কে অ্যান্থ্রোপোসিন বলে অভিহিত করা হল। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের শোষণমূলক কার্যকলাপের দায় সমগ্র মানবজাতির উপর চাপিয়ে দিতে পৃথিবীর ভূতাত্বিক ইতিহাসের সাম্প্রতিকতম এই সময়কালকে অ্যান্থ্রোপোসিন বলে দাগিয়ে দেওয়া হলেও, বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাড়ার জন্য পণ্যের ভোগ বা ব্যবহারকে দায়ী করা হলেও আসল দায়ী হল এইসমস্ত দূষণকারী দ্রব্যের পূঁজিবাদী উৎপাদন। সমগ্র মানবজাতিকে দায়ী করে আসলে উৎপাদন থেকে ভোগের দিকে, ভূমির অপব্যবহার ও প্লাস্টিক দূষণের দিকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়া হল। বহু ইতিহাসবেত্তা ও সমাজবিদ এই সময়কালকে ক্যাপিটালোসিন বলছেন, কেন না পরিবেশে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সিংহভাগ আসে উৎপাদন থেকে, পণ্যভোগ থেকে আসে সামান্যই।
‘প্রকৃতিকে মানুষ জয় করে ফেলেছে বলে আমরা যেন আত্মশ্লাঘায় না ভুগি। আমাদের প্রত্যেকটা জয়ের প্রতিশোধ নেয় প্রকৃতি। প্রত্যেকটা জয় প্রথমে আমরা যা চেয়েছি সত্যিই তাই ঘটিয়েছে, কিন্তু পরে তা অন্যরকম কিছু ঘটিয়েছে, অপ্রত্যাশিত এমন কিছু ফল ফলেছে, যা প্রথমটিকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। যেসব মানুষ মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, এশিয়া মাইনর এবং অন্যত্র আবাদী জমি পেতে অরন্য ধ্বংস করেছিল, তারা স্বপ্নেও ভাবেনি যে অরন্যের সঙ্গে সঙ্গে আর্দ্রতার সংগ্রাহক কেন্দ্র তথা আধারকেও ধ্বংস করে তারা আসলে ঐ দেশগুলোর আজকের রুক্ষতার ভিত্তিস্থাপন করছে। আল্পস পার্বত্য অঞ্চলের ইতালিয়রা যখন দক্ষিণ ঢালের পাইন বনগুলি কেটে ফেলছিল, তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে এর ফলে পাহাড়ী ঝর্ণাগুলো বছরের বেশীর ভাগ সময় জল না পেয়ে বর্ষাকালে সমতলে মূষলধারায় বর্ষণ নামাতে পারে। সুতরাং প্রত্যেকটা ধাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিদেশী জনগণের উপর একজন বিজয়ী যেভাবে শাসন চাপিয়ে দেয় সেভাবে, প্রকৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের মত করে, আমরা কিছুতেই প্রকৃতিকে শাসন করতে পারি না – বরং রক্ত-মাংস-মস্তিষ্কসমেত আমরা এই প্রকৃতিরই অংশ, প্রকৃতির মাঝেই বিরাজমান, এবং এর উপর আমাদের সব ওস্তাদির মোদ্দা কারণ এই যে অন্য সমস্ত জীবের চেয়ে আমাদের একটা বাড়তি সুবিধে রয়েছে, তা হল আমরা প্রকৃতির নিয়মকানুনগুলো শিখতে ও সেগুলোকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম।’ – এঙ্গেলস তাঁর ‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ থিসিসে ‘বানর থেকে মানুষে রূপান্তরে শ্রমের ভূমিকা’ অধ্যায়ে লিখছেন।
নিউইয়র্ক সিটি ইউনিভার্টির পাবলিক হেলথের অধ্যাপক নিকোলাস ফ্রডেনবার্গ গতবছর মে মাসে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে লিখেছেন, ‘ক্রমবর্ধমান তথ্যপ্রমাণ বলছে একবিংশ শতাব্দীর পূঁজিবাদ বিশ্বে রোগের বোঝা বাড়াচ্ছে, স্বাস্থ্যে অসাম্য বাড়াচ্ছে – শুধু বিভিন্ন দেশের মধ্যেই নয়, দেশগুলির অভ্যন্তরেও। কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বায়ন যেমন আন্তর্জাতিক সীমানা ডিঙিয়ে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, তেমনি অস্বাস্থ্যকর পণ্য এবং দূষণও ছড়াচ্ছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার বেসরকারীকরণ, কর্মীবর্গের বেতন হ্রাস, উৎপাদিত পণ্যের নিরাপত্তা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের দিকে কম মনোযোগ – এইসবের মূলে রয়েছে আর্থিকীকরণ। বিজ্ঞাণ ও প্রযুক্তিতে কর্পোরেট-আধিপত্যের ফলে ভেষজশিল্পে, খাদ্যে, পরিবহনে নতুন নতুন আবিষ্কারসমূহ মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবার বদলে মুনাফা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।’
ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা কেবল শ্রমজীবী মানুষকেই শোষণ করে না, বেশী বেশী মুনাফার লোভে এই গ্রহকেও চূড়ান্তভাবে শোষণ করছে। পূঁজিবাদী ব্যবস্থা সামাজিক ন্যায় ও পৃথিবীর প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে জীবনধারণের পক্ষে মোটেই উপযুক্ত নয়। কানাডার লেখিকা নাওমি ক্লেইন তাঁর ‘দিস চেঞ্জেস এভরিথিং : ক্যাপিটালিজম বনাম ক্লাইমেট’ বইয়ে লিখেছেন, জলবায়ুর এই অধঃপতনের জন্য না মানুষ দায়ী, না কার্বন, দায়ী এই উপাদানগুলোর একটা নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা – অর্থাৎ পূঁজিবাদ, যে ব্যবস্থার একটাই লক্ষ্য – শোষণের জন্য নতুন নতুন ক্ষেত্র ও ফন্দিফিকির খুঁজে বের করা। তিনি আরো লিখছেন, ‘পূঁজি শিখে নিয়েছে বিপর্যয়কেও কিভাবে গাভীর মত ব্যবহার করে মুনাফার দুধ দুইতে হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনও যে তার ব্যত্যয় ঘটাবে না, ইতিমধ্যেই তার অনেক লক্ষণ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।’ অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তন ঘটালো যে পূঁজিবাদ, এই পরিবর্তনকে ব্যবহার করে আবারো ফায়দা লুঠছে সেই পূঁজিবাদই!
জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়েই প্রধানতঃ শক্তি উৎপাদন করা হয়, যার ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গত হয়ে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় ও জলবায়ুর অনপনেয় পরিবর্তন সাধন করে। ফলে সমগ্র পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রই বিপন্ন হয়ে পড়ছে। যেহেতু পরিবেশ দূষণ রোধ বা নিয়ন্ত্রণ না করলে এর থেকে পরিত্রাণ নেই, সেহেতু জীবাশ্ম জ্বালানীর দহন ও তার থেকে উৎপন্ন পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে বিশ্বজুড়ে। সহজেই অনুমেয়, জীবাশ্ম জ্বালানীর নিষ্কাশন ও তা থেকে ভোগ্যপণ্য উৎপাদন বন্ধ না হলে দহন ও ব্যবহার কমবে কিভাবে! কিন্তু বিকল্পের সন্ধান থাকলেও ধনতন্ত্রের কোন সদিচ্ছাই নেই নিষ্কাশন ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করবার। নয়া উদারনৈতিক ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা যে মৌলিক প্রতর্কগুলোর অধীনে, যে নকশাতে কাজ করে, তা অল্প কয়েকজনের অনিয়ন্ত্রিত সম্পদবৃদ্ধির প্রবণতা রোধ করতেও সক্ষমনয়, জলবায়ু সংকট নিরসনেও অক্ষম।
১৯৮৮ সাল থেকে ১০০-টা কর্পোরেট হাউস মিলিত ভাবে ৭০ শতাংশ গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমনের জন্য দায়ী। নাসার বিজ্ঞাণী জেমস হ্যানসেন ১৯৮৮ সালেই ভূপৃষ্ঠের বেড়ে চলা উষ্ণতার দিকে তামাম বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তবুও আমেরিকা পরের দু’দশক কিয়োটো প্রোটোকল গ্রহণ করতে নারাজ ছিল। ২০০৬ সালে হ্যানসেন সতর্ক করলেন এই বলে যে, গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমনের হার কমিয়ে পৃথিবীকে ভয়াবহ পরিণতি থেকে বাঁচাতে আমাদের হাতে আর মাত্র একটা দশক রয়েছে। তারপরে আরো দেড় দশক কেটে গেছে, এর মধ্যে ওবামা প্রশাসন প্যারিস চুক্তি চূড়ান্ত করলেও ট্রাম্প প্রশাসন তাতে জল ঢেলে দিয়েছে।
শিল্পবিপ্লবের পরের তিনশো বছরে প্রত্যেক দশক তার আগের দশকের তুলনায় উষ্ণতর ছিল। এই তিনশো বছরে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এক ডিগ্রী সেসসিয়াসেরও বেশী বেড়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, হিমবাহগুলো গলছে, বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন বদলাচ্ছে। চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঘটনা তীব্রতর ও ঘন-ঘন ঘটছে। এই সমস্ত পরিবর্তন আখেরে নিরাপদ আশ্রয়, নির্মল বাতাস, নিরাপদ পানীয় জল, পর্যাপ্ত খাদ্য ইত্যাদির মত স্বাস্থ্যের সামাজিক ও পরিবেশগত নিয়ামকগুলোকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ‘বাতাসের অত্যন্ত বেশী তাপমাত্রার সরাসরি হৃদরোগ ও শ্বাসযন্ত্রের রোগজনিত মৃত্যু বাড়িয়ে দেয়, বিশেষতঃ বয়স্কদের মধ্যে। ২০০৩ সালে তাপ প্রবাহের দরুন শুধুমাত্র ইউরোপেই ৭০ হাজার বাড়তি মৃত্যু ঘটেছিল।’ এছাড়াও, উচ্চ তাপমাত্রা বাতাসে ওজোন ও অন্যান্য দূষকের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যেগুলো হৃদরোগ ও শ্বাসযন্ত্রের রোগের তীব্রতা বাড়িয়ে তোলে। ফুলরেণু ও অন্যান্য বায়বীয় অ্যালার্জেনের মাত্রাও অত্যধিক গরমে বেড়ে যায়, ফলে প্রায় ত্রিশ কোটি অ্যাজমা আক্রান্ত মানুষ বাড়তি বিপদে পড়েন।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরো জানাচ্ছে, ‘১৯৬০ সালের তুলনায় এখন আবহাওয়াজনিত বিপর্যয়ের সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে গেছে, ফলে প্রত্যেক বছর বিশ্বে অতিরিক্ত ৬০ হাজার মানুষ মারা যান, যার সিংহভাগই উন্নয়নশীল দেশে। চড়তি সমুদ্রতল এবং আবহাওয়ার বেড়ে চলা চরমভাবাপন্নতা বাড়িঘর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও অন্যান্য জরুরী পরিষেবা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’ বিশ্বের অর্ধেকের বেশী জনসংখ্যা সমুদ্রের ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে। সুন্দরবন ক্রমশঃ ডুবছে। ভারত মহাসাগরের উষ্ণতা দ্রুততম হারে বাড়ছে এবং ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রায় তিন কোটি মানুষের বাস। ঝড়ে-বন্যায় উদ্বাস্তু হবে বহু মানুষ, বাড়বে মানসিক রোগ, কর্মহীনতা, অপুষ্টি থেকে শুরু করে সংক্রামক-অসংক্রামক রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বৃষ্টিপাতের গতিপ্রকৃতির বেড়ে চলা খামখেয়ালীপনা ভূগর্ভস্থ জলস্তরে তারতম্য ঘটিয়ে মিষ্টি জলের সরবরাহেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আশঙ্কা, ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের বহু অঞ্চলে অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ চরমে উঠবে। আবার বহু এলাকা নতুন করে অতিবৃষ্টি ও বন্যাপ্রবণ হয়ে খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাঘাত ঘটবে। ভারতে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত বেড়ে ভূমিক্ষয়, ধস, বন্যায় বহু গ্রাম ও শহর ক্ষতিগ্রস্ত হল। পানীয় জলের ঘাটতি, জলে ডুবে বা তড়িদাহত হয়ে মৃত্যু, জলবাহিত রোগের মহামারীর পাশাপাশি খাদ্যাভাবে অপুষ্টিজনিত রোগভোগ বৃদ্ধির ঘটনা দেখা গেল। জমা জল মশা-মাছিসহ নানা পতঙ্গ ও শামুকজাতীয় ঠান্ডা রক্তের প্রাণীর বাড়বাড়ন্তের কারণ হয়ে উঠছে, ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গুর মত পতঙ্গবাহিত রোগ ও সিস্টোসোমিয়াসিস ইত্যাদি রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। মশাবাহিত রোগের সংক্রমণ আগে ছিল বর্ষাকালের সমস্যা, এখন বছরভর এই সমস্ত রোগ ছড়াচ্ছে, যেসব এলাকায় এসব রোগ তেমন হত না, সেখানেও প্রচুর সংক্রমণ হচ্ছে। মিষ্টি জলের সংকটের দরুন স্বাস্থ্যবিধি শিকেয় উঠে ডায়ারিয়া জাতীয় রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। এমনিতেই এধরণের রোগে ভুগে প্রতি বছর ৫ লক্ষাধিক শিশুমৃত্যু হয় সারাবিশ্বে। ইউনিসেফ ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে বিশ্বের কোন শিশুই জলবায়ু সংকটের প্রভাবমুক্ত নয়। নিষ্পাপ শিশুরা কোনভাবেই এই সংকটের জন্য দায়ী নয়, অথচ তাদেরকে এর ফল ভুগতে হচ্ছে! ফলে জলবায়ু আন্দোলনে ক্রমশঃ অল্পবয়সীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। সুইডেনের গ্রেটা থুনবার্গ, ভারতের দিশা রবি, জোয়েল কিন্ডিয়ার মত দেশে দেশে অসংখ্য কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী স্কুলে হরতাল করছে, সংসদ অভিযান করছে, পূর্বজ প্রজন্মের কাছে সোচ্চার দাবী জানাচ্ছে তাদের বসবাসের জন্য এক স্বাস্থ্যকর গ্রহ রেখে যেতে।
শিল্পবিপ্লবের সময় থেকে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির বৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসাবে কাজ করছে জীবাশ্ম জ্বালানী এবং জলবায়ুকে বিপদগ্রস্ত করছে, কিন্তু নয়া উদার অর্থনীতির হাতে পড়ে তা বেলাগাম সংকট ডেকে এনেছে। এই সংকট মোটেই সরলরৈখিক নয়, বরং জটিল ও বহুমাত্রিক। যেমন, উত্তর মহাসাগরের বরফাচ্ছাদন থেকে মিথেন গ্যাস নির্গমন, সমস্ত মহাসাগরের কার্বন সম্পৃক্তি এবং নির্বিচারে রেইন ফরেস্ট ধ্বংস জলবায়ু সংকটকে জটিলতর করে তুলেছে। অথচ একের পর এক কিয়োটো, কোপেনহেগেন, ডারবান, প্যারিস, এমনকি হালের গ্লাসগো সম্মেলনেও কার্যকরী কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা গেল না! ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমনের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথা উপেক্ষা করে আমেরিকা ২০৫০ সালে ‘মোট শূণ্য নিঃসরণে’ পৌঁছানোর কথা বললেও গরীব ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি যে আর্থিক দায়যদ্ধতা নেবার কথা ছিল, তা বেমালুম এড়িয়ে গেল। জলবায়ু সংকটকে সামনে রেখে মার্কিন নেতৃত্বে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দ্বন্দ্ব অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে।
‘পূঁজি’-র তৃতীয় খন্ডে মার্ক্স লিখছেন, ‘সমাজের উচ্চতর অর্থনৈতিক কাঠামোর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এক-আধজনের হাতে দুনিয়ার ব্যক্তিগত মালিকানা ঠিক ততটাই অযৌক্তিক ঠেকবে যতটা অযৌক্তিক একজন মানুষের উপর আরেকজনের ব্যক্তিগত মালিকানা। এমনকি, একটা সমগ্র সমাজ, একটা জাতি বা একই সময়ে বিদ্যমান সমাজসমূহের সমষ্টি একসাথেও দুনিয়ার মালিক হতে পারে না। তারা শুধুমাত্র এর ভোগদখলকারী, তাদের অবশ্যই একে উন্নত অবস্থায় পরবর্তী প্রজন্মগুলোকে হস্তান্তর করে যেতে হবে।’
কোভিড অতিমারী বিশ্বে অসাম্যকে প্রকট করে দেখিয়ে দিল যে নয়া উদারনৈতিক পূঁজিবাদ বিজ্ঞাণ ও প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে প্রয়োগ করার চেয়ে মুনাফা বাড়াতেই বেশী আগ্রহী। অতিমারী হোক বা জলবায়ু সংকট, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ হল গ্রামীণ দরিদ্রতম মানুষ, সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং বর্ণগত ও লিঙ্গগত ভাবে দুর্বল শ্রেণী। মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থবাহী বর্তমান এই ব্যবস্থার পরিবর্তে তাই নতুন একটা ব্যবস্থাপনা জরুরী, যেখানে অগ্রাধিকার পাবে প্রকৃতির অধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, জলবায়ু সংক্রান্ত কাজে কর্মসংস্থান, সামাজিক মালিকানায় পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদন, নিশ্চিত ও ভদ্রস্থ ন্যূনতম রোজগার, সুসমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা, খাদ্য সার্বভৌমত্ব, সংহতিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, জমি, জল ও সাইবার স্পেস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের স্বার্থরক্ষা। জরুরী, ‘হেলথ ইন অল পলিসি’ গ্রহণ করা – যে কোন ক্ষেত্রের, যে কোন নীতি নির্ধারণ করবার আগে এই গ্রহের ও মানুষের স্বাস্থ্যে তার কী প্রভাব পড়বে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তবেই নীতি প্রণয়ন ও গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপর কার্বন-ট্যাক্স চাপিয়ে দিয়ে বা কার্বন ক্রেডিটের মত কূটকৌশল আখেরে কোন কাজে আসবে না।
বর্তমান বিশ্বের মূল দ্বন্দ্বগুলোর অবসান ঘটার পরেও মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির শোষণমূলক, স্বল্পমেয়াদী সম্পর্ক ও তার দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার দ্বন্দ্ব রয়েই যাবে। কিন্তু সেই দ্বন্দ্ব যাতে বৈরিতামূলক না হয়, তার তীব্রতা যাতে স্তিমিত হয়ে আসে, সেই লক্ষ্যে পরিবেশ রক্ষার জন্য ছোট-বড় সব লড়াই – মুম্বাইয়ের আরে পার্ক বাঁচানোর লড়াই আর কোলকাতায় যশোর রোডের গাছ বাঁচানোর আন্দোলন, অস্ট্রেলিয়ার কারমাইকেল কয়লাখনি বন্ধের দাবীতে লড়াই আর দেওচা-পাঁচামীর আদিবাসীদের প্রতিরোধ, থুনবার্গের ডাকে বিশ্বজুড়ে ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ আর পুরুলিয়ার তিলাবনী পাহাড় রক্ষার দাবীতে উপজাতিদের সমাবেশকে এক সুতোয় বাঁধতে হবে। তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে বীমাভিত্তিক স্বাস্থ্যের বদলে সরকারী স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে শক্তিশালী করবার জন্য জনস্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন, স্বাস্থ্যপরিষেবার বেসরকারীকরণের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষকের লড়াই, ওষুধের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জনমতকে। তাই এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের অঙ্গীকার হোক জনস্বাস্থ্য-জনবিজ্ঞাণ-পরিবেশ আন্দোলনকে এক সূত্রে বেঁধে আমাদের গ্রহ, আমাদের স্বাস্থ্য বাঁচানোর দুনিয়াজোড়া লড়াইকে সংহত করা, তীব্রতর করা।
